দ্বীপ চন্দ্র সরকার:
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ও পালকি গাড়ির চালক মো. মানিক মিয়া (৪০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার পর তোপের মুখে পড়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যুবদল ও ছাত্রদল।
ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে। নিহত মানিক মিয়া গৌরীপুর পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার আজিবুল ইসলামের ছেলে। পেশায় পালকি গাড়ির চালক মানিক মিয়া একসময় উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কয়েল কিনতে গেলে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুনশীর নেতৃত্বে একদল লোক মানিক মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে পশ্চিম দাপুনিয়া এলাকার হোসেন আলীর বাড়ির সামনে নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় অমানবিক নির্যাতন ও মারধর করা হয়, যা তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
নির্যাতনকারী গোষ্ঠী এখানেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা মানিকের স্ত্রী মোছা. সুমাইন আক্তার সেলিনাকে খবর দিয়ে ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে যায়। স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে মানিকের স্ত্রীর কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোনে মানিকের বিরুদ্ধে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ হওয়ার বক্তব্য রেকর্ড করিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অর্ধমৃত অবস্থায় মানিক মিয়াকে তার স্ত্রীর কাছে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ৩টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তার পা ও উরুর হাড় ভেঙে গিয়েছিল, যদিও হাড় চামড়া ভেদ করে বাইরে বের হয়নি।
নিহতের ভাই সুখ মিয়ার দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে শোয়েব মুনশী ও তার সহযোগীরা মানিক মিয়াকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের স্ত্রী সুমাইন আক্তার বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে শোয়েব মুনশীকে। এছাড়া আরও আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান জানান, পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর জড়িতদের ধরতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং অপরাধের দায় এড়াতে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভুইয়ার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে শোয়েব মুনশীকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, জনবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বহিষ্কৃত এই নেতার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় দল নেবে না। ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি শামছুল ইসলামও বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, অপরাধ করে দলে টিকে থাকার সুযোগ নেই।
একই ঘটনায় ছাত্রদলের দুই নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা হলেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সদস্য ও গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিফাত হাসান। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন তালুকদারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এই দুই নেতার বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়। ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুজ্জামান সোহেল জানিয়েছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতেই তাদের সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃত এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনি প্রক্রিয়ায় সব ধরনের সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
