নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর ঘুষ না পেয়ে ব্যাকডেটে (পেছনের তারিখে) রায় প্রদান, নথি জালিয়াতি, তথ্য গোপন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকদের সর্বস্বান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার (জেডএসও) মোঃ নাজমুল হুদা, নাজির তোফাজ্জল হোসেন, পেশকার মোঃ শামীম হোসেন এবং ভূরুঙ্গামারী সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার লতিফুর রহমান।​এই অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে গত ৬ মে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা লুৎফর রহমান ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন (ডকেট নম্বর-০৬০০৭)। প্রায় একই ধরনের অভিযোগ জমা দিয়েছেন গ্রাম পুলিশ সদস্য ইনছার আলীও।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার চর-ভূরুঙ্গামারী মৌজার (জেএল নং-৫০) ২.৫০ একর জমি লুৎফর রহমান গং ১৯৬৩ ও ১৯৬৪ সালের বৈধ দলিলমূলে এবং পরবর্তীতে ২০০৫ সালে সাব-কবলা মূলে ক্রয় করে ভোগদখল করে আসছিলেন। তাদের নামে নামজারি, খাজনা ও ডি.আর.এ রেকর্ডসহ ডি.পি খতিয়ানও প্রস্তুত ছিল। ​ঘুষের প্রস্তাব: ২০২০ সালে ৩১ ধারার শুনানিকালে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার লতিফুর রহমান মোটা অংকের ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে লুৎফর রহমানকে 'অনুপস্থিত' দেখিয়ে ১.৬২ একর জমির মধ্যে ১.৪২ একর জমি বিবাদীপক্ষের নামে রায় দেওয়া হয়। ​ব্যাকডেটে রায়: ৪২(ক) ধারায় মিসকেস (নং ৯৩/২৩) চলাকালীন ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল শুনানি শেষ হয়। এরপর নথিপত্র যাচাইয়ের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়। অভিযোগকারী জানান, জোনাল অফিসারের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এসে জানানো হয়, রায় অনেক আগেই হয়ে গেছে। বিস্ময়করভাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও অফিসের পক্ষ থেকে দলিল যাচাইয়ের চিঠি পাঠানো হলেও রায়ে তারিখ দেখানো হয়েছে ৮ এপ্রিল ২০২৫। ​তথ্য বিকৃতি: লুৎফর রহমানের বৈধ দলিল ও নামজারি থাকা সত্ত্বেও রায়ে বলা হয়েছে 'দলিলের ধারাবাহিকতা নেই'। অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষের নামজারি না থাকলেও তাদের অনুকূলে মনগড়া তথ্য দিয়ে রায় প্রদান করা হয়েছে। আমার সি.এস, এস.এ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সকল বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও শুধু ২ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় বিবাদীপক্ষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে আমার বিপক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে। জোনাল অফিসারের কাছে গেলে তিনি দাম্ভিকতার সাথে বলেন সব রায় সঠিক দিলে আদালত কী করবে? আপনারা ট্রাইব্যুনালে যান। একই মৌজার বাসিন্দা গ্রাম পুলিশ সদস্য ইনছার আলীও অভিযোগ করেছেন যে, তাকে কোনো নোটিশ না দিয়েই তার জমি সংক্রান্ত মামলার নথি গোপন করে রায় দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের এই সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে।

​রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের অধীনে ৫৮টি উপজেলার ৬,৭১০টি মৌজা রয়েছে। একটি মৌজা থেকেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় পুরো অফিসের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

​অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ নাজমুল হুদা আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। তবে ব্যাকডেটে রায় প্রদানের সুনির্দিষ্ট অসঙ্গতির বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।ভুক্তভোগীরা বর্তমানে ন্যায়বিচারের আশায় এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।