বিশেষ প্রতিনিধি মোঃনুরে আলম, সময়ের সাথে প্রতিদিন,

  দেখিনু সেদিন রেলে কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে চোখ ফেটে এল জল এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল কুলি মজুর কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম এভাবেই শ্রমজীবী মানুষের বন্দনা করেন। প্রতি বছর শ্রমিক দিবসে তার এই কবিতাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ১৮৮৬ সালের শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে।

বিশ ব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ পুঞ্জিভূত সংগ্রাম এবং তার অর্জনকে স্মরণ করার জন্যে প্রতিবছর ১ লা মে বিশ জুড়ে শ্রমিক দিবস পালিত হয়। দিবসটির শেকড় পোঁতা রয়েছে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্যে, যারা উন্নত কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন যুগের পর যুগ ধরে। প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন অকাতরে।বিশ জুড়ে আজ উদযাপিত হচ্ছে মহান মে দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করা হয় এই দিবসটিকে।

উনিশ শতাব্দীর আগে কারখানার শ্রমিকদের দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা এমনকি ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কিন্তু কাজ অনুপাতে পারিশ্রমিক ছিল স্বল্প। যা তাঁদের জীবনধারণের জন্য যথাযথ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে এই অতিরিক্ত শ্রমের বিনিময়ে অল্প পারিশ্রমিকে খাটিয়ে নেওয়ায় একটা পর্যায়ে শ্রমিকপক্ষ ক্ষুব্ধ হতে থাকে। যা এক সময় আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে একদল শ্রমিক মালিকপক্ষকে দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মসময় নির্ধারণের দাবি জানায়। এ দাবি পূরণের সময় হিসেবে ১৮৮৬ সালের ১ লা মে নির্ধারণ করেন শ্রমিকেরা। কিন্তু কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদের এ দাবি কানে তোলেননি। ফলাফলে ১৮৮৬ সালের ৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট নামক স্থানে ন্যায্য মজুরি এবং দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে ফের আন্দোলন গড়ে তোলেন শ্রমিকেরা। সেখানে পুলিশ আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি বর্ষণ করলে নিহত হন ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিহতদের আত্মত্যাগকে মনে রেখে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে মে দিবস বা শ্রমিক দিবস হিসেবে।

১৮৮৯ সালে ১৪ই জুলাই ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। যাহোক, ১৮৮৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব সোশ্যালিস্ট গ্রুপস এবং ট্রেড ইউনিয়নস যৌথভাবে ১ লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের সূচনা হয়। আর ১৮৯১ সালে প্যারিসেই দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। স্বীকৃতি পায় মে দিবস।পরে ১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ^ব্যাপী মে মাসের প্রথম দিন মিছিল ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল ও শ্রমিক সংঘের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ আহ্বানের সাড়া হিসেবে বিশ্বের প্রায় সব শ্রমিক সংগঠন ১ লা মে বাধ্যতামূলক কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক দেশের শ্রমিকেরা মে মাসের ১ তারিখ সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানান।১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর থেকে বিপুল সমারোহে দেশটিতে মে দিবস উদযাপিত হতে থাকে। এই উপলক্ষে দেশটিতে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হতো।যদিও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে ১৯২৩ সাল থেকে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি নি¤œমধ্য আয়ের দেশ। এই দেশে শ্রমজীবি মানুষের সংখ্যা অনেক। মহান মে দিবসের সম্মানার্থে বাংলাদেশেও ১ লা মে সরকারী ছুটির দিন। এদিন শ্রমিকরা মহা উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালন করে মে দিবস। তারা তাদের পূর্বসূরীদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো মে দিবসে আয়োজন করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমুখী কর্মসূচির। বাংলাদেশের শ্রমিকরা এদিন আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে মহান মে দিবস। পরিশেষে, ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েনের এক বিখ্যাত চিন্তাশক্তির কথা বলি। তিনিই প্রথম ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণে স্লোগান ঠিক করেন, ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম’। এই সমাজ সংস্কারকের চিন্তার প্রতিফলন আজকে বিশ^ব্যাপী প্রশংসিত এবং সমাদৃত।