নিজস্ব,প্রতিবেদক,ধনবাড়ী:সময়ের সাথে প্রতিদিন, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টার। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ফুলে-ফলে সুশোভিত এক নয়নাভিরাম প্রাঙ্গণ। বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ইমারতের পর ইমারত দেখে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু এই মনজুড়ানো সৌন্দর্যের আড়ালেই চাপা পড়ে আছে সাধারণ কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস আর অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির এক অন্ধকার ইতিহাস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মূল বীজ বপন করা হয় বিগত ২০১৮ সালের দিকে। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের প্রভাব খাটিয়ে তার ভাই উপসহকারী উদ্যান কর্মকর্তা মো. জলিল এবং তৎকালীন উদ্যানতত্ত্ববিদ কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলামের যোগসাজশে সেন্টারটি পরিণত হয় দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। অভিযোগ রয়েছে, ইসলামিক লেবাসের আড়ালে মাজেদুল ইসলাম ছিলেন চরম অর্থলোভী। অন্যদিকে জলিলের বেপরোয়া আচরণ ও ক্ষমতার দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সাধারণ কর্মচারীরা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যান লুটপাট। তবে মাজেদুল ইসলামের শেষ রক্ষা হয়নি। দুর্নীতির দায়ে স্থানীয়দের রোষানলে পড়ে রাতের আঁধারে প্রশাসনের সহায়তায় অনেকটা কলঙ্কজনকভাবেই কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। কিন্তু এরপরও থেকে যান মন্ত্রীর ভাই জলিল, হাতিয়ে নেন কোটি টাকার সম্পদ।
মাজেদুলের বিদায়ের পর উদ্যানতত্ত্ববিদ হিসেবে এখানে যোগদান করেন কৃষিবিদ রাসেল পারভেজ তমাল, যিনি এখনও কর্মরত আছেন। যোগদানের শুরুতে তমাল একাধিকবার সাংবাদিকদের কাছে জলিলের প্রভাব, অর্থলোভ ও নিচু মানসিকতার সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একপর্যায়ে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনিও জলিলের সাথে আপস করেন এবং দুর্নীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন। তৎকালীন সময়ে ক্ষমতার দাপটের কারণে এসব অনিয়মের খবর সেভাবে প্রকাশ্যে আসেনি।
দিন গড়িয়ে আসে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট ২০২৪)। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জলিলকে বিভাগীয় আদেশে অন্যত্র বদলি করা হলেও, বহাল তবিয়তে রয়ে যান তমাল সাহেব। দেশে চলমান অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এবং উপজেলা প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি এখানে গড়ে তুলেছেন নিজের একক আধিপত্য। বর্তমানে এই সেন্টারে কোটি কোটি টাকার ৮ থেকে ১০টি প্রকল্প চলমান থাকলেও, সেখানে কী হচ্ছে তার কোনো তদারকি নেই। রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকায় রয়েছেন বিভাগীয় কর্মকর্তারা।
তমালের স্বেচ্ছাচারিতা ও বৈষম্যমূলক আচরণে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছেন কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, দুর্নীতির বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখতে গত ঈদুল ফিতরে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৬৫ জন কর্মচারীর মাঝে ২০০ থেকে শুরু করে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত 'উৎকোচ' বা বখশিশ হিসেবে বণ্টন করেছেন। পদ ও ব্যক্তিভেদে এই টাকার অংকেও ছিল ব্যাপক বৈষম্য। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপুল অর্থের উৎস কোথায়?
এই নীরব ও ধারাবাহিক দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ কৃষকরা। কৃষকদের প্রশিক্ষণের ন্যায্য ভাতা আত্মসাৎ, প্রদর্শনীর সমুদয় মালামাল গায়েব এবং অভ্যন্তরীণ ক্রয়-বিক্রয় ও নির্মাণকাজ নিজের কর্তৃত্বে রেখে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
ফুলের সুবাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই দুর্নীতির দুর্গন্ধ এখন আর চাপা নেই। কেউ যে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে নয়, তা প্রমাণ করার সময় এসেছে। প্রতিটি চলমান প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের অধিকার রক্ষায় দ্রুত বিভাগীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অথবা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
কৃষিবিদ রাসেল পারভেজ তমাল তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,আমার এইখানে নিয়মিত ২৮জন শ্রমিক রয়েছে। আমি প্রত্যেকটি শ্রমিককে সন্তুষ্টি ও খুশি রাখার জন্য ঈদের সালামি হিসাবে ২০০ টাকা করে ঈদ উপহার দিয়েছি আমার হল রুমে। শ্রমিকদের জিজ্ঞাসা করলে তারাও একই কথা বলে। আর যন্ত্রপাতি বিষয় নিয়ে কথা বললে রাসেল পারভেজ তমাল বলেন সরকার থেকে আমাদের এখানে কোন যন্ত্রপাতি আসে না।
