বিশেষ প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল এস এম আব্দুর রাজ্জাক : সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক ও রুটিন প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো কোনো কর্মকর্তার বিদায় সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে কাঁদিয়ে যায়। তারা প্রমাণ করে যান, পদ বা ক্ষমতা নয়, বরং সততা ও কর্ম দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যায়। ঠিক এমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী ও ঘাটাইল উপজেলার সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সাইদ। সম্প্রতি এক প্রজ্ঞাপনে ঘাটাইল থেকে তার বদলির আদেশ জারি হওয়ার পর স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আক্ষেপ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
ধনবাড়ীতে মডেল উপজেলার স্বপ্ন এবং মানুষের আপনজন: গত ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর ধনবাড়ী উপজেলা প্রশাসনে ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন আবু সাইদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি ধনবাড়ীকে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। প্রশাসনের প্রতিটি দপ্তরে নজরদারি বাড়ানো থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে ওঠেন তিনি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন ধনবাড়ীবাসীর অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। তার এই অভাবনীয় কর্মদক্ষতা দেখেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে ধনবাড়ী থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে জেলার অন্যতম বড় উপজেলা ঘাটাইলে বদলি করেন। ধনবাড়ীর মানুষ সেদিনও তার জন্য প্রাণভরে দোয়া করেছিলেন।
ঘাটাইলে সেবার দৃষ্টান্ত ও সততার 'মাশুল': ঘাটাইলে যোগ দেওয়ার পরও আবু সাইদ সাধারণ মানুষের সেবক হিসেবে নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখেন। কিন্তু ঘাটাইলের মতো একটি জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভালো কাজের মূল্যায়ন পাওয়া যে কতটা কঠিন, তা তার বদলির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়।
এ প্রসঙ্গে মো. ইয়ামিন হাসান নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা ফেসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছেন, "দলকানা হয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি ঘাটাইলের প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক চর্চা। যার কারণে ঘাটাইলে ভালো অফিসারের মূল্যায়ন কম। জনাব আবু সাইদ ইউএনও মহোদয়, আপনার বড় অপরাধ ফেয়ার একটা নির্বাচন করা, পাহাড়ি লাল মাটি কাটা বন্ধ করা, সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শুনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং শিক্ষাঙ্গনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা অর্জন করা। তবে ঘাটাইলবাসী আপনাকে আজীবন মনে রাখবে।"
শহীদ আবু সাঈদের প্রতিচ্ছবি ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা: মানুষ চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়— এটাই চিরন্তন সত্য। কিন্তু আবু সাইদ যেন এর ব্যতিক্রম। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন একটাই কথা— কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক আবু সাঈদ নিজের জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন, আর এই ইউএনও আবু সাইদ তার নিরলস সেবা ও সততার মাধ্যমে যেন সেই শহীদের আকাঙ্ক্ষাকেই বাস্তবে ফুটিয়ে তুলছেন। তিনি বাংলাদেশের যে প্রান্তেই বদলি হয়ে যান না কেন, সেখানকার মানুষের কাছে তিনি সেবক হিসেবেই থাকবেন।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি: সাধারণ মানুষের দাবি, আবু সাইদ-এর মতো সৎ, পরিশ্রমী ও জনবান্ধব কর্মকর্তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যারা অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ করেন, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেন এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করেন, তাদের যেন এমন কোনো স্থানে পদায়ন করা হয় যেখানে তারা দেশের ও দশের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারেন। ঊর্ধ্বতন প্রশাসন তার এই সততা ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করে তাকে যোগ্য স্থানে পদায়ন করবে— এমনটাই প্রত্যাশা টাঙ্গাইলবাসীর।
