গাজীপুর প্রতিনিধি :- মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। 

সময়ের সাথে প্রতিদিন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহারিয়ার খাঁন আনাস বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার আগে মা-বাবার কাছে একটি চিঠি লিখে গিয়েছিল। তাতে সে বলেছিল, ‘স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না’।আনাসের মা সানজিদা খান ২০২৫ সালের শুরুর দিন প্রথম আলোতে একটি লেখা লিখেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘যে সন্তানদের রক্তে নতুন বাংলাদেশ পেলাম, সে বাংলাদেশটা ভালো থাকুক, তা-ই চাই।’২০২৫ সালের আজ শেষ দিন, ৩১ ডিসেম্বর। আজ কি জোর গলায় বলা যায়, বাংলাদেশ ভালো আছে? মানবাধিকার, বাক্‌স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার কি নিশ্চিত হয়েছে? আয়বৈষম্য কি কমেছে, মানুষ কি স্বস্তিতে ও নিরাপদে আছে? ‘প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরও তো জানা’ (বব ডিলানের গান ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ডের কবির সুমনের ভাবানুবাদ)।এটা সত্য যে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গুম, খুনের মতো মানবাধিকার হরণ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু মবের (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) হাতে মানবাধিকার হরণ নতুন করে সামনে এসেছে। সরকার বা সরকারের কোনো ‘এজেন্সি’ আগের মতো সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে না, কিন্তু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হামলার ভয় বেড়েছে।ন্যায়বিচারের প্রশ্নে উত্তরটি নেতিবাচকই থাকবে। অবিচারের ক্ষেত্রে শুধু পক্ষ বদলেছে। মানুষ নিরাপদে নেই, জাতীয় নিরাপত্তার সংকটের প্রশ্নও সামনে আসছে। আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেই। কাজ, রোজগার, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হতাশ মানুষ, যা উঠে এসেছে প্রথম আলোর জাতীয় জনমত জরিপ-২০২৫ এ।সব মিলিয়ে বছরটি ছিল অনিশ্চয়তার। বছরজুড়ে মানুষের মনে প্রশ্ন ছিল, সংস্কার হবে কি, নির্বাচন হবে কি, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে? বছরের শেষে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটলেও এখন সন্দেহ তৈরি হয়েছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে কি?অনিশ্চয়তা শুধু আলোচনার বিষয় ছিল না, এটা অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন সরকারের অপেক্ষায়, তাই যথেষ্ট বিনিয়োগ হচ্ছে না। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ক্রেতারা খরচ করতে দ্বিধায় থাকেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, বেচাকেনায় গতি কম।সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয় যে গণ-অভ্যুত্থানের পর এমন পরিস্থিতি বিভিন্ন দেশে হয়েছে। অর্থনীতি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরং ভালো করেছে। রাষ্ট্রীয় মদদে বড় দুর্নীতি কমেছে, অর্থনীতির পতন সামলানো গেছে, জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচারে অগ্রগতি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ আলোচনা করেছে, জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে, সেটা নিয়ে গণভোট হবে। বেশ কিছু সংস্কার হয়েছে, হচ্ছে—যেমন বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় করে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।অবশ্য জুলাইয়ে মানুষের যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে প্রাপ্তি বেশি নয়। বছর শেষ হওয়ার দুদিন আগে আনাসের মা সানজিদা খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশটা যেভাবে চলার কথা, সেভাবে চলছে না।’