ডিজাইন: ইমেজ বন্ধ
শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৈনিক সময়কাল

সরকারি কর্মকর্তাকে সাংবাদিকদের ফুলেল সংবর্ধনাঃ পেশাগত নীতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন।


কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্মস্থলে যোগদান কিংবা বিদায় উপলক্ষে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা প্রায়শই নজর কাড়ে। তবে সাংবাদিকতার সার্বজনীন নীতি ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ডে এমন আচরণকে রীতিমতো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চর্চা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অপক্ষপাত সাংবাদিকতার মূল চেতনার পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালা (Journalistic Ethics) অনুযায়ী, একজন সাংবাদিকের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও প্রশ্নকর্তার। কিন্তু সরকারি কোনো কর্মকর্তাকে ফুল দিয়ে বরণ বা বিদায় জানানোর মাধ্যমে গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে একটি অনভিপ্রেত ঘনিষ্ঠতার বার্তা পৌঁছায়। সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞদের মতে- 🔸সাংবাদিকদের প্রধান কাজ নিরপেক্ষ থাকা। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রীতি প্রদর্শন করলে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও পক্ষপাতহীন সংবাদ পরিবেশন করা মানসিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। 🔸গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের "চতুর্থ স্তম্ভ" বলা হয়, যার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতাশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা (Watchdog role)। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সংবর্ধনা প্রদান এই স্বাধীন নজরদারির অবস্থানকে শিথিল করে এবং গণমাধ্যমকে সরকারের প্রশংসাকারীতে রূপান্তরের ঝুঁকি তৈরি করে। 🔸সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান নীতি হলো নিরপেক্ষতা রক্ষা করা। কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা কিংবা স্থানীয় প্রভাব খাটানোর উদ্দেশ্যে ফুলেল শুভেচ্ছা জানালে তা সরাসরি "স্বার্থের দ্বন্দ্ব" তৈরি করে। 🔸সংবাদের উৎসের (Source) সঙ্গে পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা সাংবাদিকতার প্রাথমিক শর্ত। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর ফলে সাংবাদিক ও কর্মকর্তার মধ্যকার সেই পেশাগত সীমানা (Professional Boundary) মুছে যায়, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করে। 🔸অনেক সময় অসাধু বা বিতর্কিত কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংবর্ধনা নিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেন। এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যায় যে কর্মকর্তাটি সৎ এবং নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের সমর্থনপুষ্ট, যা প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনিক অনিয়মকে আড়াল করতে সাহায্য করে। 🔸সাধারণ পাঠক ও দর্শকরা যখন সাংবাদিকদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার প্রতি অতি-অনুগত আচরণ করতে দেখেন, তখন সংবাদমাধ্যমের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্যের সততা নিয়ে জনগণের মনে তীব্র সংশয় তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো সৌজন্যমূলক অভ্যর্থনার আয়োজন করে থাকে। তবে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে এমন প্রথা থেকে দ্রুত সরে আসা প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় হওয়া উচিত পেশাগত দূরত্ব, সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার—সংবর্ধনার নয়।